ঢাকা, সোমবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২০ , , ১ জমাদিউস সানি ১৪৪১

অধ্যাপক পারভেজ’র গ্রন্থ “সুষম সমাজ বিনির্মাণ” যেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার ফ্রেমওয়ার্ক

জুলফিকুর মুর্তজা জুলফি । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০১৯ ৮:১৭ সকাল

ঢাকা :: সহস্র বছরের শোষণ-বঞ্চণায় বিশ্বকবির সোনার বাংলা মূলত শোষণের বাংলা হয়ে ওঠে।ব্রিটিশদের শোষণের শাসনে বাংলাদেশ যেন এক মহা-শ্বশানে পরিণত হয়েছিল।ব্রিটিশরা বিদায় নিলেও পশ্চিম পাকিস্তানীরা এই দেশকে নব্য উপনিবেশে পরিণত করে নতুন মাত্রায় শোষণ শুরু করে ।

মওলানা ভাসানী পাকিস্তানী শোষকদের বিদায়ী সালাম জানিয়ে যে স্বাধীকার আন্দোলন সূচনা করেন।তাঁর মানসপুত্র বঙ্গবন্ধু সেই স্বাধীকার আন্দোলনকে সাফল্যমণ্ডিত করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরেও পশ্চিমাদের পোড়ামাটির নীতিতে বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে কাপুরুষের মতো গণহত্যা যজ্ঞ শুরু করে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেনর।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নয় মাসব্যপী সশস্ত্র সংগ্রামের পর ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাগর পেরিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশের।

নব্য স্বাধীন বাংলাদেশকে সোনার বাংলা করে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তা তিনি শুরু করলেও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি।স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে-তিন বছরেই এই জাতীয়তাবাদী মহান নেতাকে দেশি-বিদেশি কুচক্রি-মহলের প্ররোচনায় সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

ফলে স্বাধীনতার ফসল আজও সব মানুষের ঘরে পৌঁছেনি।আজও গৃহহীন, কর্মহীন কোটি মানুষ।দারিদ্র আজও জনগণের সঙ্গী। বঙ্গবন্ধু-কন্যা এখন দেশের কর্ণধার তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে চান। কিন্তু সত্যি কি সম্ভব বাংলাদেশকে সোনার বাংলা রূপে গড়ে তোলা ?

এই জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতেই অর্থনীতির অধ্যাপক পারভেজ যিনি নিজেকে অর্থনীতির ছাত্র বলতেই ভালোবাসেন- তিনি অত্যন্ত সহজ-সরলভাবে সোনার বাংলা তথা সুষম সমাজ গড়ার পথ বাৎলে দিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের কাজ রাষ্ট্রকে- সরকারকে উন্নতির সোপান দেখানো।এই পথ দেখানো কঠিন কাজটা হাতে নিয়েছেন অধ্যাপক পারভেজ।
সমাজতত্ব ও অর্থনীতির জটিল বিষয়কে তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ’ নামক গ্রন্থে ।এজন্য পাঠককে সমাজবিজ্ঞান বা অর্থনীতির ছাত্র হবার প্রয়োজন পড়েনা।

‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” নামক গবেষণামূলক গ্রন্থে তিনি দেশের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্রমুক্ত, অবক্ষয়মুক্ত, কর্মমূখর সম্মৃদ্ধ এক সমাজের কাঠামোর চিত্র উপস্থাপন করেছেন।যে সমাজে দারিদ্র, বেকারত্ব ও অবক্ষয় ঠাই পাবে না।
তাঁর গ্রন্থের মূখবন্ধ পাঠে জানা যায় যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছ, তাই কথার মার-প্যাচে না গিয়ে খুব সাদাসিধা ভাবে যে সমাজব্যবস্থার ফর্মূলা দিয়েছেন, তা শুধু বাংলাদেশ নয় বরং বিশ্বের অনেক দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধির দিশারী হতে পারে।পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের পথ না মাড়িয়ে কি ভাবে একটি বিকল্প সমাজ ব্যবস্থা গড়া যায়, তারই বয়ান এই ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ’ নামক গবেষণামূলক গ্রন্থ।
তিনি তাঁর ‘উপলব্ধি’তে বয়ান করেছেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্ধশতক পার হলেও আজও জন-মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি।আজও দেশের গরিষ্ঠ মানুষ শোষণ-বঞ্চনায় জর্জর।দেশের কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্রতায় জীবন যাপন করে।এই দারদ্রি দূর করা না গেলে সত্যিকারের কোন টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।অথচ তিনি ধনী এক বণিক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও মাটি ও মানুষের এতা কাছাকাছি এলেন কি করে, তা বিশ্ময় সৃষ্টি করে!
“অবাক পৃথিবী” পরিচ্ছদে তিনি দেখিয়েছেন কি ভাবে শোষণ শুধু রাষ্ট্রের ভিতরেই নয়, বিশ্বজুড়ে তা বিদ্যমান। বিশ্বের ৭৫% সম্পদ দখল করে আছে মাত্র ১৫টি রাষ্ট্র ! শামন্ত যুগেও যেমন, বর্তমান পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাতেও তেমন- সম্পদ ক্ষমাতাবান ও শক্তিশালীদের হাতে কুক্ষিগত হয়।
অধ্যাপক পারভেজ-এর দিক-দর্শন এখানেই।তিনি বলছেন, কেন্দ্রিভূত অর্থ-সম্পদকে অলসভাবে না রেখে তা বিকেন্দ্রিভূত করতে হবে।সমাজের প্রতিটি অংশে অর্থ সঞ্চালিত করা গেলে সমাজ সচল হবে এবং মানুষের দারিদ্র-মুক্তি সম্ভব হবে। তিনি উদাহরন দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, বৈষম্য থাকলে টেকসই উন্নয়ন কোন মতেই সম্ভব হবেনা ।
“স্ফুলিঙের উন্নয়ন বনাম টেকসেই উন্নয়ন” পরিচ্ছদে তিনি উদাহরনসহ দেখিয়েছেন অর্থ থাকলেই হবেনা।বরং অর্থের যথার্থ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক সফলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবেনা।
অধ্যাপক পারভেজ-এর মতে সমাজকে সম্মৃদ্ধ ও স্থিতিশীল করতে হলে বেকারত্ব দূর করতে হবে, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করতে হবে।তবেই টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে সম্মৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও অবক্ষয়মুক্ত সমাজ তথা ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” সম্ভব হবে।
অধ্যাপক পারভেজ ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” এ সমাজ ও অর্থনীতির নতুন এক দর্শন উপস্থাপন করেছেন।তিনি পুঁজিবাদের শোষণ ও সমাজতন্ত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণের বাহিরে গিয়ে জীবনমূখী এক অর্থ-ব্যবস্থার কথা বলছেন।আর তা হচ্ছে, রাষ্ট্রের হাতে ও ব্যাংক-বীমার হাতে পুঞ্জিভূত অর্থকে বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে সাধারণ সব মানুষের মাঝে প্রবাহিত করা।সমাজের সর্বস্তরে অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত হলে সার্বিক উন্নয়ন আপনা-আপনিই সম্ভব হবে এবং সামজিক অবক্ষয় দূর হয়ে যে সুষম সমাজ তৈরী হবে, তাকেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাঙলা বলা যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদের দেখা যায় সব সময় সরকারের মুখোমুখী দাঁড়াতে।এক্ষেত্রে অধ্যাপক পারভেজ বিকল্প পথে হেঁটেছেন।অর্থনীতিবিদরা উন্নয়নের পথ বাৎলে দেন। সরকার তা গ্রহণ করতেও পারে, আবার নাও পারে।তবে গ্রহণযোগ্য ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে পারে একমাত্র সরকারই।তাই অধ্যাপক পারভেজ হয়তো ঐপথে হাঁটছেন। তিনি নীতি নির্ধারক ও বাস্তবায়কদের মনের অন্দর-মহলে তার সুষম সমাজ বিনির্মাণের চেতনাকে ‘পুশ’ করতে চান।কারণ তার দিক-দর্শন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার গড়ার চেতনার সমার্থক।তাই তাঁর লক্ষ সহজেই সাফল্যমণিষ্ডত করা সম্ভব হবে।

‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” গ্রন্থে তিনি ‘সুষম সমাজের ধারণা দিয়েছেন এবং তা বাস্তবায়নে ২৭ দফার প্রস্তাবনা দিয়েছেন। তাতে তিনি প্রথমেই রেখেছেন বেকারত্ব দুরীকরণের কথা। বেকারত্ব যে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বড় অন্তরায় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।আর বেকারত্ব দূর হলে ঐ ব্যক্তি ও তার পরিবার মৌলিক চাহিদার পুরণের তাড়ণা থেকে মুক্তি পায়।
তিনি ২য় দফায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন তা হচ্ছে, মাথাপিছু গড় আয় নিয়ে আমরা বাগাড়ম্বর করে থাকি।কিন্তু তিনি বলছেন, যদি ঐ পরিমান অর্থ যদি প্রতিটি মানুষের কাছে পৌছানো যায়, তবে, সমাজ থেকে দারিদ্র নির্বাসনে যাবে।
৩য় দফায় অধ্যাপক পারভেজ মান সম্মত চিকিৎসার ও গুণগত মান সম্মন্ন ডায়াগনস্টিক ল্যাবের কথা বলেছেন।তাঁর দাবীটি যৌক্তিক।আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মান নিম্নমূখী !ভালো চিকিৎসক থাকলেও পেশাদারী মনোভাবের অভাবে চিকিৎসা এখন সেবা নয় চিকিৎসা এখন পণ্যে পরিণত হয়ে গেছে।
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও চিকিৎসা ব্যয় ও সূচিকিৎসার পরিবেশের আভাবে দেশের গরিষ্ঠ মানুষই একদম ঠেকে না গেলে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হয়না।এজন্য দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থা হারিয়ে অনেকেই বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান।এতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মদ্রা ব্যয় হয়।
আমাদের দেশের ডায়াগনস্টিক ল্যাবের গুণগত মান এতোটাই করুণ যে বিদেশের কোন দেশেই তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়না।দামী দামী বিদেশী মেশিনপত্র থাকলেও দক্ষ টেকনিশিয়ান ও অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্ট এর আভাবে এবং মান নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা না থাকায়। প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টগুলো যথার্থ হয়না।
অধ্যাপক পারভেজ তাই মান সম্মত চিকিৎসার ও গুণগত মান সম্মন্ন ডায়াগনস্টিক ল্যাবের বিষয়টি দে-ভালের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন একটি মান নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দাবী জানিয়েছেন।
এতে মান সম্মত চিকিৎসার ও গুণগত মান সম্মন্ন ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট পাওয়ায় রূগিদের সুচিকিৎসাও পাওয়া যাবে এবং বৈদেশিক মূদ্রারও সাশ্রয় হবে।

৪র্থ দফায় অধ্যাপক পারভেজ প্রশিক্ষিত নার্সের কথা বলেছেন। দেশে ডাক্তারের অনুপাতে নার্সের যথেষ্ট ঘাটতি আছে তার উপর দেশের নার্সরা সত্যিকারের পেশাজীবী মানসিকতায় প্রশিক্ষিত নন। তাই রোগিীরা যথার্থ সেবা থেকে বঞ্চিত হন। এই বঞ্চণা দূর করতে হলে প্রতিটি মেডিকেল কলেজে নার্সিং ইনষ্টিটিউট খোলার কথা বলেছেন অধ্যাপক পারভেজ।

৫ম দফায় খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর ব্যবস্থার কথা বলেছেন অধ্যাপক পারভেজ।তাঁর মতে খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মানুষের রোগ-বালাই কমবে। সুস্থ শরীর সুস্থ জাতি গঠনেও ভেজাল নিয়ন্ত্রণ আতি জরুরী তাই তিনি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

৬ষ্ট দফায় অধ্যাপক পারভেজ আইনের শাসণ ও বিচার ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রিভুত করতে এবং আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলেছেন।দেশের নিম্ন আদালতের কথা বাদ থাক উচ্চ আদালতেই যখন লাখ লাখ মামলা বিশাল মামলাজটের সৃষ্টি করেছে সেখানে অধ্যাপক পারভেজ এর এই দাবী গুলি কতটা যৌক্তিক তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।আইনের শাসন বলতে তিনি আইনের যথার্থ প্রয়োগের কথা বলেছেন।আইনের যথার্থ প্রয়োগ না হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠত হবেনা বলে অধ্যাপক পারভেজ মনে করেন।

৭ম দফায় অধ্যাপক পারভেজ অরাজকতা বন্ধে মোবাইল কোর্টের কথা বলেছেন।দেখিয়েছেন।এতে করে নারী-নির্যাতন,খুন-ধর্ষণের মতো সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
আমাদের আইন শৃংখলা বাহিনীর সক্ষমতা এতোটাই বাড়াতে হবে যে যেখানেই অপরাধ সংগঠিত হবে সেখানেই দ্রুত শৃংখলা বাহিনী উপস্থিত হয়ে অপরাধীকে ধরে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে অরাধীকে আদালতে সোপর্দ করতে হবে। এতে দেশের সব জায়গায় মানুষের অপরাধ প্রবণতা কমবে।

৮ম দফা প্রস্তাবনায় অধ্যাপক পারভেজ সুষম বাজেটের বিষয় এনেছেন।সুষম বাজেট নাহলেউন্নয়ন সম্ভব হনো বলে তিনি মনে করেন।২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বাজটকে হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। যে বাজেট প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র দুর করবে।বেকার শ্রেণীর চাকুরীর ক্ষেত্র নিশ্চিত করবে এবং দেশের সকল ক্ষেত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে সম্মৃদ্ধ করবে।আমাদের দেশের বাজেট মূলত ধনিক শ্রেণীর বাজেট বললে আতুক্তি হয়না । এই ট্রেন্ড থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে বলে অধ্যাপক পারভেজ মনে করেন।তিনি সরকারের রিজার্ভ ফাণ্ডের বিপরীতে সভরেন বন্ড চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।সম্পদের আপচয় রোধ করে চাকরী ও উদ্যোক্তা তৈরীর কতঅ বলেছেন।
সম্পদ পাচার বন্ধ করে পুঁজিবাজারে গতি আনাতে ব্যবসাবান্ধব বাজেট তৈরীর পথও তিনি দেখিয়েছেন।

৯ম দফা তিনি বাজেটের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন যার উত্তরের মধ্যেই পাওয়া যাবে ঐসব বিষয়ের সমাধান। স্থানাভাবে এই সব বিষয়ের অভ্যন্তরে আমার যেতে চাইনা। এজন্য পাঠককে বইখানা পাঠ করতে হবে।

১০ম দফায় অধ্যাপক পারভেজ বাজেট ও ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে গরিব-বান্ধব করতে পরামর্শ দিয়েছেন। যা দেশের বর্তমান অর্থব্যবস্থা থেকে উত্তরণে বিশেষ ভাবে জরুরি।দারিদ্র উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় তাই বাজটেকে গরিববান্ধব করা না গেলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

১১তম দফায় অধ্যাপক পারভেজ ব্যাঙ্কিং খাতকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান আর্থিক খাত ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধি করছে বলে তিনি দেখিয়েছেন। তাঁর তথ্যমতে দেশের ব্যাঙ্কিং খাতের ৮০% টাকা যাচ্ছে দেশের মাত্র ১০% মানুষের হাতে । পক্ষান্তরে ৯০% মানুষের জন্য বিনিয়োগ করা হচ্ছে মাত্র ২০% অর্থ ! অথচ দেশের ঐ ৯০% মানুষই এই অর্থের বড় যোগান দাতা। চমকে দেয়ার মতো এই তথ্যই বলে দেয় এই আর্থিক ব্যবস্থায় দেশের উন্নয়ন তো দূরের কথা তা দারিদ্রকে আরও প্রসারিত করবে।

১২তম দফায় অধ্যাপক পারভেজ কালো টাকার উৎস বন্ধ করতে বিভিন্ন পথ বাৎলে দিয়েছেন।মুলত সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে দুরর্নীতি কমবে এবং কালো-টাকার উৎসও বন্ধ হবে বলে তিনি মনে করেন।

১৩তম দফায় অধ্যাপক পারভেজ সুষম ঋণ বন্টনের দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন।তিনি ব্যাংক সমূহের আমানতের ৩০% বৃহৎ ঋণ, ২৫% ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ, ১০% নারীদের জন্য, ২০% নতুন উদ্যোক্তাদের এবং ৫% প্রতিবন্ধীদের মাঝে বিতরণের পরামর্শ দিয়েছেন। এত সমাজের সব শ্রেণী-মানুষের কাছে অর্থের প্রবাহ বাড়ায় সুষম সমাজ তথা সোনার বাঙলা গড়া সহজতর হবে।

১৪শ দফায় নারীদের ঋণ পাওয়ার সমান সুযোগ। ১৫শ দফায় নতুন উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করার মতো যৌক্তিক বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেছেন। যা দেশের সমন্বিত উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। ঋণের সুদের হার কমানোর উপরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।অর্থের অভাব উন্নয়নের বড় অন্তরায়।

১৬তম দফায় অধ্যাপক পারভেজ উন্নয়নের স্টার্ট আপের জন্য সরকারী প্রকল্প বৃদ্ধির কথা বলেছেন। এতে নতুন নতুন কর্ম সংস্থান হবে্, বেকারত্ব হ্রাস পাবে এবং সামাজিক অস্থিরতাও দূর হবে।সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু করতে হলে আত্মকর্ম সন্থানমূলক সকল সেবা, এগ্রোবেস্ড, আইটি, নানা রকম শিল্প স্থাপন করতে হবে।

১৭তম দফায় সামাজিক অবক্ষয় বিশেষ করে মাদক বিস্তার রোধী দিক-নির্দশনাও তার গ্রন্থে এসেছে সমচীন ভাবেই। ১৮ তম দফায় বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষাসহ সকল প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় অধ্যাপক পারভেজ ডোপ টেস্টের উপর জোর দিয়েছেন।

১৯তম দফায় ঘুষ ছাড়া ব্যাংক লোন প্রাপ্তি সুযোগ সৃষ্টির কথা বলেছেন অধ্যাপক পারভেজ ।২০তম দফায় স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য উন্নত জীবন এবং আবাসন ব্যবস্থা গড়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এছাড়াও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী দশ হাজার টাকা করা।প্রতিটি পলিটেকনিক স্কুলে ড্রাইভিং ডিপার্টমেন্ট খোলাসহ প্লাম্বিং, ইলেকট্রিশিান, পেইন্টার ইত্যাদি বিষয়ক ট্রেড কোর্স চালু করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন।এছাড়াও বয়সের কারণে যাতে মানুষ চাকুরী বঞ্চিত না হয় সেদিকেও রাষ্ট্রর নজর রাখা উচিৎ বলে অধ্যাপক পারভেজ মনে করেন।

২৬তম দফায় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করেছেন । তা হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য স্পন্সর গ্যারান্টির ভিত্তিতে শিক্ষাঋণ চালু করার প্রস্তাব। এটা চালু হলে অনেক ছাত্র-চাত্রীর উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত হবে।
২৭তম ও শেষ দফায় অধ্যাপক পারভেজ ওয়েজ আর্নারদের বিষয়টা তুলে ধরেছেন। এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদেশে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে পাঠান। তারা প্রায় অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত। বিমান বন্দরে এই সব যাত্রীরা প্রায়ই হয়রানির স্বীকার হয়ে থাকেন।তিনি এইসব হয়রানী বন্ধ করার জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ারও উপায় বাতলে দিয়েছেন।

অধ্যাপক পারভেজ-এর গ্রন্থ “সুষম সমাজ বিনির্মাণ” বাস্তবায়িত হলে মানুষের মৌলিক চাহিদা যথা বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসার আভাব দূর হবে।মানুষের বেকারত্ব দূর হয়ে একটা ভারসাম্যময় সমাজ গঠিত হবে। একটি দেশ ও জাতির সামগ্রীক উন্নয়নে তিনি বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন তাঁর এই গ্রন্থে। একটা সুষম সমাজ গঠনে এমন দিক-নির্শেনামূলক গ্রন্থ সরাচর দেখা যায়না, এটা অধ্যাপক পারভেজ-এর সাফল্য।
মোদ্দাকথা বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি ।তা বাস্তবায়নে এই গ্রন্থ দিক-নির্দেশনার কাজ করবে।
আমরা আশা করি বঙ্গবন্ধু-কন্যা এই গ্রন্থে অনুপ্রাণিত হবেন এবং তাঁর পিতার অসমাপ্ত বিপ্লব স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে তাঁর সহায়ক গ্রন্থ হবে বলে আমরা মনে করি।

একটি সম্মৃদ্ধ জাতি ও দেশ গঠনে তথা সুষম সমাজ গঠনে তিনি যে সকল প্রস্ততাবনা পেশ করেছেন, তা এই স্বল্প পারিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়।তাই সবাইকে আহবান জানাবো এই গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য।
অলঙ্কৃত সুদৃশ্য কভারে মোড়া মেশিন-মোল্ডিং-এ বাঁধাই করা ১৫৪পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি একটি তথ্য ও তত্ত্ব-বহুল গ্রন্থ। যা সবার পাঠ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
গ্রন্থে কিছু দুর্লভ চিত্র, ডাটা ও তথ্যপুঞ্জি ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর দুটি মূল্যবান ভাষণ সংযোজন করা হয়েছে।যা গ্রন্থটিকে আরও সম্মৃদ্ধ করেছে।আমি গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।

 

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক




%d bloggers like this: