ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ , , ৭ রবিউস সানি ১৪৪১

বঞ্চিত পথশিশুদের আপন মনে করে বুকে জড়িয়ে নেওয়া

কক্সবাজার । সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: নভেম্বর ২৫, ২০১৯ ১২:৩০ দুপুর

সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অনেক মানুষ পৃথিবীতে এসেছে আবার চলে গেছে। তবে থেকে গেছে
একটা জিনিস যে জিনিসটা সমাজে সৃষ্টি করে দিয়ে চলে গেলেও তা আজও চলমান রয়েছে। আর
সেটি হলো বৈষম্য। জন্মের পর থেকে আমরা বাবা-মায়ের আদরে বড় হয়, ভালো বিছানা, ভালো
খাবার, ভালো পোশাক, ভালো স্কুলে পড়ালেখা করি। কিন্তু আমাদের চারপাশে এমনও অনেকে রয়েছে
যে ভালো পোশাক, স্কুল, বিছানা, ভালো খাবারতো দুরের কথা দিনে ৩ বেলার জায়গায় ২বেলাও খেতে
পারে না ভালো করে। তারা কেউ এমনি করে এই অবস্থায় চলে আসে নি। পরিস্থিতি তাদের এখানে
নিয়ে আসছে। তাদের জীবন আর আমাদের জীবনের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।

যেমনঃ-
১. তারা বাঁচে সংগ্রাম করে আর আমরা বাঁচি শৌকিন কিংবা ফ্যাশন করে।
২. তারা শরীরের ঘাম ঝরিয়ে টাকা উপার্জন করে। আর আমরা আয় করি তাদের ব্যবহার করে।
৩. তারা ঘুমাই হয়তোবা মাটিতে আর আমরা ঘুমাই ভালো বিছানায়।
৪. তারা কুড়ে ঘরে আর আমরা তাদের ঘামে থাকি।আসল মানুষঃ-
আমরা যাদের জন্য আজ সভ্যতা পেয়েছি তাদেরকে ছোটলোক বলে অপবাদ দিয়ে থাকি। শুধু
অপবাদ নয়। তাদেরকে শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন রকম অত্যাচারও অনেক সময় করা হয়। সেই
সময় আমরা ভুলে যাই সেই খাবারের কথা। যে খাবার আমরা খাচ্ছি সেটা কোথায় থেকে, কার থেকে,
কিভাবে আসলো সেটা ভুলে। আমরা যাদের পরিশ্রমের ফলাফলে বড়লোক হলাম সেখানে তাদেরকে
বঞ্চিত করি। গরীবের টাকা আত্মস্বাত করে আমরা বড়লোক আর তারা সব দিয়েও গরীব। আসলেই
আমরা এতো কিছু তাদের কাছ থেকে নেওয়ার পরেও তাদের জন্য কিছুই করার মনোভাব পায় না।
কারণ, আমরা অমানুষ আর তারা মানুষ বলে সব দিতে পারে। আমরা এতো কিছু করার পরেও চাইলে
মানুষের জন্য কিছু করতে পারি। যেমনঃ মনে করেন, কেউ বিপদে পড়লো তাকে সেখান থেকে উদ্ধার
করার চেষ্টা করতে হবে। হয়তো আমরা তাকে উদ্ধার করতে পারবো না। তবুও তো তাকে পাশে থেকে
অনুপ্রেরণা দিতে পারি যাতে সে এগিয়ে আসতে পারে। সে যেন মনে করতে পারে কেউ একজন আছে
যে অন্ততপক্ষে তাকে অনুপ্রাণিত করবে। এমনও অনেক পথশিশু আছে যারা ঠিক মতো খেতে পারে
না, পোশাক পায় না। আমরাতো কতো পোশাক পরিধান করি দামি দামি। যদি আমরা একটু তাদেরকে
মানবিক দৃষ্টিতে চেয়ে একজোড়া সুন্দর কাপড়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারি তাহলে তার মনে পোশাকের
যে একটা অভাব ছিলো সেটা মিটে যাবে। সেও হয়তো আমার আর আপনার মতো পোশাকে ঘুরতে
পারবে এই প্রকৃতিতে। সাপ্তাহিক যে কাপড় পরিবর্তন করি মার্কেটে গিয়ে সেখান একটা কাপড়ের দামে
হয়তো একজনকে হলেও খুশি করা যাবে।
আজ সর্বত্রই দেখা যায় বড় লোকের ছেলে মেয়েরাই ভালো ভালো স্কুল, কলেজে ভর্তি হতে পারে।
শিক্ষামূলক সকল অনুষ্ঠান কিংবা প্রতিযোগিতায় ধনবান ব্যক্তির সন্তানেরা অংশগ্রহণ করতে পারে।

তবে এই স্বার্থপরের দুনিয়ায় শুধু দৌড় প্রতিযোগিতা, উচ্চ লাফ কিংবা দীর্ঘ লাফের মতো খেলাগুলোয়
তাদেরকে দেওয়া হয়। তবুও তারা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। তাদের ভিতরে লুকিয়ে থাকে
হাজারো স্বপ্ন। যে স্বপ্ন এই দেশ ও এদেশের মানুষের জন্য। অথচ পারিবারিক ও সামাজিক কারণে তারা
তাদের স্বপ্নকে ধরে রাখতে পারে না। অবশ্যই যারা সকল পরিস্থিতির সামনে ঠিকে থাকে তারা এই
পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এবং থাকবে। তাদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা হাজারো প্রতিভার বিকাশে
সহায়তা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই তাদেরকে যদি একবার সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে
হয়তো সেও একটা আলোকিত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতো।
গরীব ঘরের অনেক সন্তান প্রতিভাবান মেধা নিয়ে সামনে এগুতে চাই। কিন্তু আর্থিক সংকটের জন্যে
সে আর পড়তে পারে না, বিকশিত করতে পারে না তার মেধা, দেশের উন্নয়নের জন্য তার যে সমস্ত
আশা ছিল সব বিলিন হয়ে যায় সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে। অথচ লক্ষ লক্ষ কিংবা কোটি টাকা ব্যাংকে
রিজার্ভ করে রেখেছি। তবুও অচিরেই হারিয়ে যাচ্ছে এমন সম্ভাব্য মূল্যবান রতনকে আমরা একটু
হাতটা বাড়িয়ে দিই না। এমুহুর্তে তাকে ঠেস দেওয়ার মতো একটা গাত থাকলে হয়তো সেও সমাজ
সংস্কারকাজ করে জন সেবা করতে পারতো।
আমাদের এই অর্থ থেকে যদি তাদেরকে কিছু হলেও আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে তার স্বপ্নের বাস্তবায়নে
ধাবিত করতে পারি তাহলে হয়তো সে একটা আলোকিত মানুষ হতো শুধুমাত্র। কিন্তু দেশ ও জাতি পেত
এক উজ্জ্বল আলোকিত প্রদ্বীপ। আমরা রাতে খেয়ে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়ি। অথচ আমার পাশের
বাড়ির লোকজন না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করতেছে। সেদিকে খেয়াল আমাদের থাকে না।
আমরা যদি এই অনাহার লোকগুলোকে অন্ততঃপক্ষে এক মুঠো খাদ্য তুলে দিয়ে তাদের ক্ষুধার তৃষ্ণা
একটু কমাতে পারি তাহলে হয়তো সে মানুষগুলো একদিন অন্য কোন মানুষ কিংবা প্রাণীকে একই
ভাবে সহযোগিতা করতো। ফলে একটা বন্ধন হতো ভালো। সমাজের কিছু বিত্তবান অসাধু লোকের
অত্যচারে লোকজন নিজের অধিকার হারিয়ে ফেলে। তারা স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে না। ফলে
তারা ভুলে যায় স্বাধীনতা নামক একটি শব্দের বিশাল জীবন। একসময় সে নিজেও অন্যের অধিকারে
হস্তক্ষেপ করে। সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এসব খারাপ লোকগুলের খপ্পর থেকে বঞ্চিত, অবহেলিত,
অত্যাচারীত লোকজনকে উদ্ধার করে তাদেরকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলে হয়তোবা তারাও একদিন
অন্যজনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম করবে। তাই তাদেরকে অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে সুযোগ
দেওয়া কোন মহা ভুল হবে বলে মনে হয় না।আমরাতো অনেক কিছু করতেছি। কতো আনন্দ
করতেছি, মজা করতেছি। কিন্তু এইসব থেকে একটু সময় কমিয়ে দিয়ে মানব সেবায় যদি নিজেকে
বিলিয়ে দিতে পারি তাহলে হয়তো আমরা মানুষের কাতারে আসতে পেরেছি বলে দাবী করতে পারবো
অন্যথায় মরিচিকা ছাড়া কিছু নয়।

আমাদের করণীয়ঃ-
১. বঞ্চিত পথশিশুদের আপন মনে করে বুকে জড়িয়ে নেওয়া।
২. খাদ্যহীন লোকদের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা।
৩. বস্ত্রহীনদেন বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
৪. সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা।

৫. বঞ্চিতদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
৬. বিপদকালীন সময়ে মানুষের পাশে দাড়াতে হবে। ৭. অন্যের অধিকার হস্তক্ষেপ না করা।
উক্ত অর্পিত দায়িত্বগুলো পালনের কারণঃ-
১. আমরা মানুষ। তাই মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষকে সাহায্য করা আমাদের ধর্ম।
২. আমাদের স্রষ্টা হয়তো ভিন্ন নামে পরিচিত সবার কাছে। তবুও স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস রেখে আমরা
স্রষ্টার সৃষ্টির সেবা করবো।
৩. অধিকার ছাড়া কোন মানুষ বাঁচতে পারে না। তাই তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজেদের জীবন
বাজি রেখে হলেও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের মৌলিক ধর্ম।
৪. আমরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি এসব আমাদের ধর্ম নয়। আমাদের ধর্ম মানব ধর্ম।
সুতরাং একটা কথা মনে রাখা উচিত, "মাটি ও পানি ছাড়া বৃক্ষের যে অবস্থা অধিকার ও স্বাধীনতা
ছাড়া মানুষেরও একই অবস্থা।"

লেখকঃ- আবদুল নবী,
কক্সবাজার সিটি কলেজ, কক্সবাজার।




%d bloggers like this: