ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০ , , ২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

আহমদীয়া হওয়ায় কবর থেকে তুলে রাস্তায় ফেলা হলো শিশুর মরদেহ

সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: জুলাই ১০, ২০২০ ১১:০০ সকাল

[addtoany]

আহমদীয়া সম্প্রদায় বলে শিশুর মরদেহ কবর থেকে তুলে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় ফেলে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।  বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের ঘাটুরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তবে রাতে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় আহমদীয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফেনী সদর উপজেলার বাসিন্দা ও সেখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বিয়ে করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঘাটুরা এলাকার স্বপ্না বেগমকে। স্বপ্না বেগম বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারী কলেজে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। স্বপ্নার বাবার বাড়ি ঘাটুরা গ্রামে হওয়ায় কয়েক মাস ধরে তিনি বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। গত ৭ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের খ্রীস্টিয়ান মেমোরিয়াল হাসপাতালে ওই দম্পতির ঘরে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। নির্ধারিত সময়ের আগে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিশুটিকে হাসপাতালে ইনকিউবেটরে রাখা হয়। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে শিশুটি মারা যায়। ধর্মীয় রীতি মেনে সেইদিন সকাল ৭টার দিকে শিশুটির মরদেহ ঘাটুরা এলাকার একটি সরকারি কবরস্থানে দাফন করা হয়। কিন্তু আহমদীয়া সম্প্রদায়ের হওয়ায় দাফনের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আহমদীয়া বিদ্বেষীরা এলাকায় মাইকিং করেন। পরে মরদেহ কবর থেকে তোলার জন্য লোকজন জড়ো করেন। এরপর নবজাতকের মরদেহ কবর থেকে তুলে কবরস্থানের বাইরের সড়কে ফেলে রেখে যায় আহমদীয়া বিদ্বেষীরা। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কেউ মুখ খোলেননি।শিশুটির পিতা সাইফুল ইসলাম জানান, আমি এই এলাকার জামাই। এলাকা সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। আমার বাচ্চাকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দীর্ঘদিনের পুরোনো ঘাটুরা কবরস্থানে দাফন করি। এর কিছুক্ষণ পর এলাকায় আহমদীয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মাইকিং করে আহমদীয়া বিদ্বেষীদের জড়ো করা হয়। এরপর মরদেহ কবর থেকে তুলে কবরস্থানের সীমানা প্রাচীরের বাইরে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনিও জানিও না। পরবর্তীতে এলাকার লোকজনের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ আসে। পুলিশি প্রহরায় ওইদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় আমাদের সম্প্রদায়ের নিজস্ব কবরস্থানে নিয়ে মরদেহ দাফন করা হয়।তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি জানতে পেরেছি ঘাটুরার এই কবরস্থানের জায়গার দাতা একজন হিন্দু ভদ্রলোক ছিলেন। এরপর থেকে এলাকার আহমদীয়া সম্প্রদায়ের লোকজন মারা গেলে এখানে গত ৫০ বছর ধরে দাফন করে আসছেন। যদি তাদের কোনো আপত্তি থাকতো- তাহলে আমাদের বলতে পারতো পরবর্তীতে আর যেন কাউকে এই কবরস্থানে দাফন করা না হয়। কিন্তু দুই দিনের একটা শিশুর মরদেহ কবর থেকে তুলে ফেলে দিবে এটা কল্পনাও করা যায় না। এর বিচার আল্লাহ করবেন। স্থানীয় আহমদিয়া জামাতের সভাপতি এসএম ইব্রাহিম জানান, বৃহস্পতিবার সকালে এলাকার প্রতিটি মসজিদ থেকে মাইকিং করেন স্থানীয় মসজিদের মৌলভী সাহেবরা। তারা মাইকিংয়ে আহমদীয়া বিদ্বেষীদের জড়ো করেন। তবে তাদের ডাকে স্থানীয়রা আসেননি। কারণ স্থানীয়রা জানেন দীর্ঘদিন ধরে ঘাটুরা কবরস্থানে আহমদীয়া মুসলমান সম্প্রদায়ের দাফন হয়। তাই তারা আসেননি। তবে যারা এসেছে তারা বিপদগামী তরুণ সদস্য। তারাই এসে কবর থেকে শিশুটিকে তুলে রাস্তায় ফেলে রাখে। খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানা থেকে একদল পুলিশ আসে। পুলিশ এসে জানতে চায় মাইকিং কারা করছে। পরে মনির হোসেন নামে স্থানীয় একটি মসজিদের মৌলভী সাহেব পুলিশকে বলেন, আমি মাইকিং বন্ধ করার ব্যবস্থা করছি। এ সময় আহমদীয়া বিরোধীরা আশ্রাব্য ভাষায় আমাদের গালাগাল করেন।তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দেশের প্রচলিত আইনের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে বিচার দেন। ঘটনার পরবর্তী সময়ে ঘটনাস্থলের পাশের জনপ্রতিনিধি সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হাজারি আঙ্গুর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তার সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে তার বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।তবে সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. মহসিন খন্দকার বলেন, কবরস্থানটি পিনাকী ভট্টাচার্য নামে একজন হিন্দু দানবীর ব্যক্তি দান করেছিলেন। এর পর থেকে আহমদীয়া সম্প্রদায় এবং মুসলমানেরা একই কবরস্থানে কবর দিয়ে আসছিলেন। তার পিতা মেম্বার থাকাকালে দ্বিখণ্ডিত কবরস্থানটিকে একিভূত করেছিলেন। কিন্তু গতকাল একজন আহমদীয়া শিশুর কবর দেয়াকে নিয়ে ঘটে বিপত্তি। এর আগে এমনটি হয়নি। এলাকার হুজুররা বাধা দিয়েছেন আহমদীয়া সম্প্রদায়ের কাউকে কবর দেওয়া যাবে না। আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে বলতে চাই, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ঘাটুরা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বজায় ছিল। এটা বজায় থাকবে। কারো আপত্তি থাকলে তারা অন্য কবরস্থানে কবর দিতে পারেন। তাহলেই তো এ নিয়ে ঝামেলা হয় না। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সেলিম উদ্দিন জানান, এলাকাবাসী দুইপক্ষের সাথে আলোচনা করার পর শিশুটির মরদেহ কান্দিপাড়া এলাকায় আহমদীয়া সম্প্রদায়ের কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।কারা এমন অমানবিক ঘটনা ঘটিয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাব কথা বলতে চাননি ওসি সেলিম উদ্দিন।