ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০ , , ২২ জ্বিলকদ ১৪৪১

মাস্ক কেলেঙ্কারি: আমিনুলের প্রতিষ্ঠানে তাজুলের প্রতারণা!

সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: জুন ৭, ২০২০ ৯:০৩ দুপুর

[addtoany]

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট :: করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সার্জিক্যাল মাস্ক আমদানি করতে গিয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিনের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ এনে মামলাও করেছে খোদ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরই। তবে প্রতারণা ও ভুয়া কাগজ ব্যবহারের অভিযোগ আনলেও কাগজপত্রে দেখা গেছে, মালিকানা তার হলেও ব্যবসায়িকভাবে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ‘ব্যবসায়িকভাবে কোন ধরনের দায়দায়িত্ব না নেওয়া’র শর্তে লিখিত অঙ্গীকারনামা নিয়ে আরেকজনের হাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভার তুলে দিয়ে নিজেই প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় এই আওয়ামী লীগ নেতা।

সূত্র জানায়, নিম্নমানের ৫০ হাজার কেএন-৯৫ মাস্ক আমদানি করতে গিয়ে প্রতারণা ও ভুয়া কাগজ ব্যবহারের অভিযোগে মহাখালী ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফখরুল ইসলাম বাদি হয়ে এলান কর্পোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম আমিনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। গত ২৯ মে রাজধানীর বনানী থানায় ৪৬৮, ৪৭১ ও ১৯৮ ধারার মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘(এলান কর্পোরেশনের আমিনুল ইসলাম) জাল ও বানোয়াট কাগজপত্রাদি দাখিলের মাধ্যমে করোনাভাইরাস জনিত (কোভিড-১৯) রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের ব্যবহারের জন্য কেএন-৯৫ মাস্ক আমদানি করে জনজীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।’

জানা গেছে, গত ১৮ এপ্রিল ৫০ হাজার কেএন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের জন্য ঢাকার পুরানা পল্টনের এলান কর্পোরেশনের স্বত্ত্বাধিকারী আমিনুল ইসলামকে কার্যাদেশ দেয় ঢাকার মহাখালীর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গত ১৮ মে ঢাকা শুল্ক বিভাগ থেকে মাস্কগুলো খালাসের জন্য অনাপত্তিসূচক সনদও দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানতে পারে, অনাপত্তি নেওয়ার জন্য এলান কর্পোরেশন যেসব কাগজপত্র দেখিয়েছিল, সেগুলো ভুয়া।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফ্রি সেল সার্টিফিকেটটি মাস্ক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিজেই ইস্যু করেছে। অথচ এটা ইস্যু করার কথা ড্রাগ রেগুলেটরি অথরিটির। অন্যদিকে আইএসও সার্টিফিকেট ইস্যুকারী জার্মান প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, এলান কর্পোরেশনের দেওয়া সার্টিফিকেটটি চীনের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা। অথচ এলান কর্পোরেশনের দাখিল করা কাগজপত্রে লেখা ছিল চীনের জিয়ামেন টেকনোলজি নামের ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের নাম।

এতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নিশ্চিত হয়েছে, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এলান কর্পোরেশন কেএন-৯৫ মাস্ক আমদানির মাস্কটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে সনদ জাল করেছে। এরপরই গত ২৭ মে মাস্ক আমদানির জন্য দেওয়ার অনুমোদন ও অনাপত্তি সনদ বাতিল করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এর দুদিন পর ঢাকার বনানী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অভিযোগপত্রের শেষাংশে বলা হয়, ‘তাই, মেসার্স এলান কর্পোরেশন, ৬০/এ পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ স্বত্ত্বাধিকারী মো. আমিনুল ইসলাম, স্থায়ী ঠিকানা-গোলাম মহিউদ্দিন পাড়া, বারদোনা, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম-এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পেনাল কোড ৪৬৮, ৪৭১ ও ১৯৮ ধারায় মামলা রুজু করার জন্য অনুরোধ করা হল।’

মামলায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মোট আটজনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন উপ পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা, তিনজন সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা, দুজন অফিস সহকারী ও একজন উচ্চমান সহকারী।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘এলান কর্পোরেশন’-এর নাম ব্যবহার করে ব্যবসা করতেন ঢাকার হাজারীবাগের ভাগলপুর লেনের তাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অভিযোগে গত ২৮ মে এই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করেছে ঢাকার বনানী থানার পুলিশ। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

কাগজপত্রে দেখা গেছে, গত ২৫ মার্চ ‘এলান কর্পোরেশনের’ মূল মালিক আমিনুল ইসলাম ও তাজুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তির মধ্যে একটি অঙ্গীকারনামা দলিল সম্পাদিত হয়। সেখানে ওই তারিখ থেকে ‘এলান কর্পোরেশন’ এর নাম ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা ও তার সমস্ত দায়-দায়িত্ব বহন করার অঙ্গীকারনামা দেন তাজুল ইসলাম।

ওই অঙ্গীকারনামা দলিলে লেখা হয়েছে, ‘বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে ঔষধ প্রশাসনের ব্যবসায়িক কাজে অংশগ্রহণের জন্য আমার পূর্ব পরিচিত মো. আমিনুল ইসলাম… তাহার ব্যবসায়িক ফার্ম ‘এলান কর্পোরেশন’ সাং-৬০/এ, পুরানা পল্টন, ঢাকা। উক্ত প্রতিষ্ঠানটির নামে আমি ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করিতে চাহিলে জনাব আমিনুল ইসলাম ইহাতে সম্মতি প্রদান করেন।

তাই অদ্য ২৫/০৩/২০২০ ইং তারিখ হইতে উপরে উল্লেখিত ঔষধ প্রশাসনে আমি উক্ত ‘এলান কর্পোরেশন’ এর নাম ব্যবহার করত যাবতীয় কাজকর্ম করিব এবং উহার সমস্ত দায়-দায়িত্ব বহন করিব। ইহাতে ‘এলান কর্পোরেশন’-এর মালিক মো. আমিনুল ইসলাম এর কোন দায়-দায়িত্ব থাকিল না। অদ্য হইতে ঔষধ প্রশাসনের কাজে ‘এলান কর্পোরেশন’এর সমস্ত কাজের তদারকি আমি নিজে করিব এবং ইহাতে জনাব আমিনুল ইসলাম কোন আপত্তি করিবে না এবং করিলেও তা সর্বাদালতে বাতিল ও অগ্রাহ্য বলিয়া গণ্য হইবে।’

মহাখালীর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ১৮ মে ঢাকা শুল্ক বিভাগ থেকে মাস্ক খালাসের জন্য অনাপত্তিসূচক সনদ দেয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে। কিন্তু এরপরই আবার ভুয়া কাগজপত্র দেওয়ার অভিযোগে সেই অনাপত্তি সনদ বাতিলও করে। প্রশ্ন উঠেছে, ১৮ মের আগে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করে সনদ দিয়েছিল?

তাছাড়া ভুয়া কাগজপত্র সরবরাহের অভিযোগ তুলেছে মাস্ক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, আমদানিকারকের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর মামলা করেছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এলান কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে।

এব্যাপারে এলান কর্পোরেশেনের মূল স্বত্ত্বাধিকারী কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন জানান, সরল বিশ্বাসে আরেকজনের হাতে অঙ্গীকারনামা নিয়েই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভার তুলে দিয়েছিলাম। তাতেই শিকার হলাম প্রতারণার। মাস্ক আমদানি থেকে শুরু করে কাগজপত্র কী দিয়েছে না দিয়েছে এসবের কোনো কিছুই আমি জানতাম না। নইলে মাত্র ৫০ হাজার মাস্কের জন্য এতো কিছু করার তো প্রয়োজন নেই আমার। এই পরিমাণ মাস্ক আমদানি করে কয় টাকাই বা লাভ?’

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনে আমি কখনও অন্যায় কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। এমনকি মাস্ক কিংবা এই ধরনের কোনো কাজের জন্য আমি কোথাও প্রভাব খাটানো তো দূরের কথা, বিষয়গুলো সম্পর্কে কিছু জানতামও না। যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে, কোনো ধরনের গর্হিত কাজে আমার সামান্যতমও সংশ্লিষ্টতা আছে, বা কোনো কাজ নিয়ে দেওয়ার জন্য একটি ফোনও করেছি— সেক্ষেত্রে যে কোনো শাস্তি আমি মাথা পেতে নেবো।’