ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০ , , ২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

‘সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন’ মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট

সি এন এন বাংলাদেশ

আপডেট: জুলাই ৭, ২০২০ ১:০৪ সকাল

[addtoany]


কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে সাংবাদিক আটক ও সাজাদানকারী ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন, তিনি সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন। গভীর রাতে আরডিসি নাজিম উদ্দিন জেলা প্রশাসকের নির্দেশনার দোহাই দিয়ে তাকে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেন। প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর প্রসিকিউশন পক্ষকে ডিসি অফিসে ডেকে এনে নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়। বিভাগীয় মামলায় অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা এসব কথা বলেছেন।
তিনি বর্তমানে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত রয়েছেন।
গত ১৪ মার্চ কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাকে ধরে নিয়ে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত এক বছরের কারাদন্ডদেয়। তার বাড়িতে আধা বোতল মদ এবং গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এভাবে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে একজন সাংবাদিককে ধরে এনে সাজা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার হলে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে। জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন ও ২ সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিভাগীয় মামলা করা হয়। সেই মামলায় আনা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন সহকারী কমিশনার ও মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা। এর আগে এস এম রাহাতুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় আনা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন।
আরডিসি নাজিম উদ্দিনের সম্পদের হিসাব চেয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
রিন্টু বিকাশ চাকমা গত ১৮ জুন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। সংঘটিত ঘটনায় তিনি মর্মাহত ও অনুতপ্ত বলে জানিয়েছেন। নবীন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। চাপে পড়ে সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করা থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখতে পারেননি বলে দাবি করেন। ১৩ মার্চ রাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়ে রিন্টু বিকাশ আগে থেকেই অবগত ছিলেন। আগের দিনই তাকে রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছিলেন। প্রশাসনের চাকরির প্রথা অনুযায়ী সিনিয়র কর্মকর্তার নির্দেশ পালন করা জুনিয়র কর্মকর্তার দায়িত্ব বলে রিন্টু বিকাশ মনে করেছিলেন। ১৩ মার্চ সকালেই আরডিসির চাহিদা ও রিকুইজিশন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি পেশকার সাইফুল ইসলামকে নির্দেশ দেন। অভিযানে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেছেন।
রিন্টু বিকাশ চাকমা জানিয়েছেন, অভিযান কখন, কোথায়, কীভাবে এবং কার বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে এ বিষয়ে তার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। মোবাইল কোর্ট অভিযানের জন্য মধ্যরাতে একটি অপরিচিত বাড়িতে উপস্থিত হলে তিনি ঐ বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন। কিছুক্ষণ পর সেই বাড়ি থেকে একজনকে আটক করে নাজিম উদ্দিন কয়েকজন পুলিশ ও আনসারসহ ডিসি অফিসে যান। রিন্টু বিকাশ এবং এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলাম অপর একটি পিকআপ ভ্যানে ডিসি অফিসে পৌঁছান। আরডিসি আটক ব্যক্তিকে তার তত্ত্বাবধানে নেন। রাত ১টা ২০ মিনিটে আরডিসি ডিসির কড়া নির্দেশনার দোহাই দিয়ে রিন্টু বিকাশকে আটক ব্যক্তির মোবাইল কোর্টের সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য চাপ দেন। সিনিয়র কর্মকর্তার চাপে তিনি মানসিকভাবে ‘ভীতসন্ত্রস্ত’ হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিকভাবে সিনিয়রদের জানানোর মতো পরিস্থিতি তার ছিল না বলে জানিয়েছেন। ঐ মুর্হূতে তিনি নিরুপায় ছিলেন বলে দাবি করেন।
এই অবস্থায়ও রিন্টু বিকাশ আরডিসি নাজিম উদ্দিনকেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অনুরোধ করেন। প্রত্যক্ষদর্শী থাকার কারণে সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করতে তিনি অস্বীকার করেন। ইতিমধ্যে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের আত্মীয়-স্বজন, অন্যান্য সাংবাদিক ও বহিরাগত লোকজন ডিসি অফিসে উপস্থিত হলে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। রিন্টু বিকাশ তার জবাবে বলেন, ‘রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর জনাব নাজিম উদ্দিনের আচরণে বিপর্যস্ত হয়ে সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই। ’ এ সময় এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলাম ও পেশকার সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর আরডিসি প্রসিকিউশন পক্ষ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. জাহিদুল ইসলামকে ডিসি অফিসে ডেকে নথিতে স্বাক্ষর করান। অভিযানে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন নাজিম উদ্দিন। আরডিসিকে এককভাবে সব কিছু করতে দেখে ডিসি অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে করছেন বলে রিন্টু বিকাশ মনে করেছিলেন।
রিন্টু বিকাশ চাকমা দাবি করেছেন, তিনি পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। সাংবাদিকের বাসায় আধা লিটার মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা পাওয়ার দাবি তিনি কখনোই করেননি এবং এ সংক্রান্ত বক্তব্য প্রদান করেননি। নাজিম উদ্দিন পেশকার সাইফুল ইসলামকে ডিসি অফিসে জব্দ তালিকা তৈরির নির্দেশ দিলে আধা লিটার মদ ও দেড়শ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের বিষয়টি তিনি জেনেছেন।